Glenrich International School

যেভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে শেখার মানসিকতা গড়ে উঠবে

আমাদের মস্তিষ্ক বা মাথা খুব বিচিত্রভাবে কাজ করে বা এর কাজের বৈচিত্র্য আছে। আমরা আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছি, যদিও আমাদের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এ বিষয়টি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। সারা পৃথিবীতে মেধা কীভাবে বিকশিত হয়, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণা থেকে এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা আমাদের আরও কৌতূহলী করে তোলে। 

মেধা কী?
আগে ধারণা করা হতো, মেধা হয়তো জন্মপ্রদত্ত কোনো বিশেষ ক্ষমতা। এটা হয়তো জেনেটিক, অর্থাৎ জন্মসম্পর্কিত বা বংশীয় কোনো ঐতিহ্য। ইদানীং এ ধারণাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে। গবেষকরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, মেধা আসলে দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিকতার সম্মিলিত ফলাফল। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে মেধা বিকশিত করা সম্ভব। এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন বেইলর ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. ঋষি শ্রীরাম। তাঁর সাম্প্রতিক কাজে উঠে এসেছে মেধাবিকাশে পাঁচ ‘এম’ বা ‘ম’-এর গুরুত্ব। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচটি ‘ম’ হলো– মানসিকতা, মায়েলিন, মাস্টারি (দক্ষতা), মোটিভেশন (প্রেরণা) ও মেন্টরশিপ।

মানসিকতা
মেধাবিকাশের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মানসিকতাকে বিবেচনা করা হয়। দেখা যায়, জিনগতভাবে প্রাপ্ত মেধা বেশির ভাগ সময়েই প্রচ্ছন্ন আকারে থাকে। তার চেয়ে বরং মানুষের মেধাবিকাশে পরিবেশগত শিক্ষা ও দক্ষতার প্রভাবই বেশি। এ কারণেই বলা হয়, মেধা অনুশীলন ও অর্জন করার বিষয়। এ ক্ষেত্রে ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’ (বিকাশের মানসিকতা) ধারণ করা খুব জরুরি বলে মনে করা হয়। গ্রোথ মাইন্ডসেট বলতে সব সময় শেখার মানসিকতা, একাগ্রতার মাধ্যমে কোনো বিষয়ের প্রতি জানাশোনার পরিধি বাড়ানোকে বোঝানো হয়ে থাকে। আর এর উল্টোদিকে, নতুন আর কিছু শেখার নেই বা মেধায় যতটুকু সম্ভব তার সবই শেখা হয়ে গেছে– এই মানসিকতাকে বলে ‘ফিক্সড মাইন্ডসেট’ (স্থায়ী বা পূর্বনির্ধারিত মানসিকতা); এটি মেধাবিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়।

মায়েলিন
জানাশোনা, শেখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ আমরা করি মস্তিষ্কের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে অর্ধেকই হলো নিউরন। বাকি অর্ধেক কোষকে বলা হয় ‘গ্লিয়াল কোষ’। লাতিন শব্দ ‘গ্লু’ থেকে এই গ্লিয়াল শব্দ এসেছে। এই গ্লিয়াল কোষগুলো সাধারণত আমাদের জন্মের সময় থেকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। নতুন কিছু করা, শেখা বা অনুশীলন করার সময় এই গ্লিয়াল কোষগুলো উদ্দীপিত হয় এবং মস্তিষ্কের বাকি নিউরনগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এভাবেই আমরা নতুন কিছু শিখি। এ সময় উদ্দীপিত গ্লিয়াল কোষের চারপাশে এক ধরনের সাদা চর্বির আস্তরণ পড়ে, যাকে মায়েলিন বলা হয়।
মায়েলিন মানে সব সময় নতুন কিছু শেখার প্রতি নিজেকে আগ্রহী করে তোলা। সে বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সচল রাখা। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই সময়কে দীর্ঘায়িত করা সম্ভব।

মাস্টারি
মাস্টারি বলতে সাধারণত কোনো বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করাকে বোঝানো হয়। তবে মেধাবিকাশের অন্যতম একটি ধাপ হিসেবে বলা যায়, আমরা যে বিষয়ে শিখতে আগ্রহী, সে বিষয়টি ধারাবাহিক অনুশীলনের মধ্যে রাখাই হলো মাস্টারি। কানাডিয়ান লেখক ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েল তাঁর ‘আউটলায়ার্স : দ্য স্টোরি অব সাকসেস’ বইয়ে সঠিকভাবে ধারাবাহিক অনুশীলনের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন। ম্যালকম জানান, যে কোনো বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠতে গেলে নিরলস ও সঠিকভাবে ১০ হাজার ঘণ্টা অনুশীলন করা জরুরি।

মোটিভেশন
একটি কাজ দীর্ঘদিন ধারাবাহিকভাবে করার পেছনে যে প্রেরণা বা উদ্দীপনা কাজ করে তা-ই মোটিভেশন। এটি সাধারণত দুই রকম হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে সহজাত, আরেকটি বাহ্যিক। মেধাবিকাশে এ দু’ধরনের মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণাই প্রয়োজনীয়। অনেক মানুষ আছেন, যারা সহজাতভাবেই নিত্যনতুন বিষয় জানতে বা শিখতে পছন্দ করেন। ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছান। আবার অনেকে আছেন, যারা বাহ্যিকভাবে অনুপ্রাণিত হতে ভালোবাসেন।
মোটিভেশনের ক্ষেত্রে তিনটি পিলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ তিনটি পিলার হলো কম্পিটেন্স বা সক্ষমতা, চয়েস অর্থাৎ পছন্দ বা বিকল্প এবং কমিউনিটি বা উপযুক্ত পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হলো সক্ষমতা। আপনি যে বিষয়ে দক্ষ হতে চাইছেন, সে সম্পর্কে যথেষ্ট জানাশোনা, অভিজ্ঞতা বা ধারণা থাকতে হবে। এর পর আসবে পছন্দ। এখানেই আসবে এই কাজটির পেছনে আপনি দীর্ঘদিন লেগে থাকবেন কিনা, এ বিষয়টি। মেধা ও দক্ষতার বিকাশে এরপরই প্রয়োজন হবে কমিউনিটি বা উপযুক্ত পরিবেশের।

মেন্টরশিপ
মেধাবিকাশের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে মেন্টরশিপকে বিবেচনা করা হয়। ধারাবাহিক ও সঠিকভাবে অনুশীলন বজায় রাখার ক্ষেত্রে মেন্টরশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মেন্টর কোনো শিক্ষক হতে পারেন, খেলোয়াড়দের জন্য কোচ হতে পারেন; অর্থাৎ যে কেউ মেন্টর হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞ মোৎজার্টের কথা উল্লেখ করা যায়। সাফল্যের পেছনে মেন্টর হিসেবে ছিলেন তাঁর বাবা। বিশ্বমাতানো এই সংগীতজ্ঞ তাঁর বাবার কাছে পিয়ানো বাজানোর তালিম নেন। এরপর দীর্ঘ একাগ্রতা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি সংগীত জগতের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন।
এখন আমরা বুঝতে পারছি, মেধা কোনো হঠাৎ পাওয়া বা জিনগত বৈশিষ্ট্য নয়। নিয়ম মেনে সঠিকভাবে ধারাবাহিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গেলে যে কেউ এই মেধা অর্জন করতে পারে। আর এ যাত্রা শুরু হতে পারে আমাদের ‘গ্রোথ মেন্টালিটি’ থেকেই।

 

লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল, দিল্লি পাবলিক স্কুল (জুনিয়র সেকশন)

 

Media Link: যেভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে শেখার মানসিকতা গড়ে উঠবে (samakal.com)